সঙ্গোপনে ৫

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা। আরো একটা দিন চিত্রা কে বেডে রেখে বাইরে আমি একা। সকালে রাগ দেখিয়ে বেড়িয়ে আসার পর দুপুরে আবার গিয়েছিলাম চিত্রার কাছে। আমার রাগ তো কিছুক্ষন পরেই ভেঙে যায়। কিন্তু চিত্রার যেই অভ্যাস, সে করবে অভিমান। আমার আর কি করার। গিয়ে অভিমান ভাঙাতে হবে। গিয়ে দেখি সকালে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঁদতে বসেছিলো, ঐভাবেই মুখ ফিরানো। কিন্তু চোখ মুখ একেবারে শুকনো। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কি যেনো ভাবছে। গিয়ে হাত ধরে ডাক দিলাম,
‛চিত্রা?’
তাও মুখ ঘুরিয়ে আমাকে দেখলো না। যেভাবে দেয়ালে তাকিয়ে ছিলো, ঐভাবেই চোখ স্থির করে রেখে দিছে। আমি হাত ধরে টান মারলাম। বললাম,
‛এই, তাকাও এইদিকে।’
টান মেরে ওর হাত তা ছাড়াতে চাইলো। বললো,
‛উফ ছাড়ো তো। তুমি যাও, বাইরে যাও। নার্স দেখলে বকা দিবে।’
আমি হাতটা কাছে টানতে টানতে বললাম,
‛তুমি আগে তাকাও আমার দিকে। না তাকানো পর্যন্ত যাবো না আর এখান থেকে।’
‛বসে থাকতে পারলে থাকো, আমার কি।’
'ক্ষুধা লাগছে তো। খাবো না?'
চিত্রা হটাৎ আমার দিকে তাকিয়ে উঠে বসতে চাইলো। বাম হাতে স্যালাইন চলছে, তাই উঠতে পারলো না। চেহারায় একটু অস্তিরতা ভাব নিয়ে বললো,
‛কি? দুপুরে খাও নাই এখনো?’
আমার সরল স্বীকারোক্তি। ঘাড় নাড়িয়ে বললাম,
‛না তো।’
চিত্রা শাসনের ভঙ্গিতে বললো,
‛যাও, খেয়ে আসো আগে। তারপর যদি এতো বসে থাকার ইচ্ছে হয়, থেকো। না করবো না।’
বুঝলাম চিত্রার অভিমান কিছুটা ভেঙেছে। আমার প্রতি এই এক ভয়ংকর দুর্বলতা ওর। অন্য যা কিছু হয়ে যাক, কিন্তু আমার খাওয়া, গোসল, ঘুম ইত্যাদি সব যত্ন ঠিকঠাক চাই। যত্ন না করলে এসে শাসন করবে। হাসপাতালে এসে আমি নিজের যত্ন নিতে পারছি না। চিত্রা সবটা জানে না। জানতে পারলে এখন আর শাসন করতো না। আরো বেশি মন খারাপ করতো। চিত্রার মন খারাপ দেখতে আমার ভালো লাগে না। বললাম,
‛এইখানে হোটেলগুলোতে রান্না একদম ভালো হয় না জানো?’
‛কি বলো? লোকে খায় তাহলে?’
‛খায় তো। সবাই খায়। কিন্তু আমি খেতে পারি না। ওরা তরকারিতে লবণ একদম বেশি দেয় না।’
কতো সময় পর চিত্রাকে আবার হাসতে দেখলাম। খানিকটা হেসে বললো,
‛পাগল হইছো তুমি? লবন বেশি দিলে ওদের তরকারি কেউ কিনবে?’
আমি বললাম,
‛কিন্তু লবন বেশি না দিলে যে আমি খেতে পারি না। বাজে লাগে। তুমি তো শিখাইছো আমাকে বেশি লবণের তরকারি খাওয়া।’
চিত্রা আরো হাসে। বলে,
‛বোকা তুমি একটা। বাড়তি লবণ দিয়ে নিলেই তো হয়।’
আমি মনে মনে হাসি। চিত্রার সামনে বোকা সাজতে খারাপ লাগে না। তরকারিতে লবণ বেশি আসলে আমার ভালো লাগে না। আমি লবণ একদম কম খাই। কিন্তু চিত্রাকে বলি অন্যটা। কারণ চিত্রা লবণ কম দিয়ে রান্না করতে পারে না। খাবারের সুন্দর স্বাদের চাইতে চিত্রার হাসিই আমার বেশি প্রিয়। চিত্রা হাসে। খুব সুন্দর লাগে সে হাসি। আমি দেখি। কিছু বলি না। আমার গলার স্বরে যদি থেমে যায় হাসি। চিত্রাই আবার কথা বলে।
‛আরে যাও তো। আর দু তিনদিন খাও এসব। তারপর বাসায় গেলে আমিই রান্না করবো।’
অভিমান পুরোপুরি ভাঙছে কিনা বুঝলাম না। ঘাড়টা সামান্য বাকিয়ে বললাম,
‛যাবো?’
‛যাবা মানে? খেয়ে তাড়াতাড়ি আসো। যাও ফাস্ট।’
ধমক দিয়ে চিত্রা হাত ছাড়িয়ে নিলো। উঠে পড়লাম। দুনম্বর গেটের বাইরে রাস্তায় সারি সারি কতগুলো খাবারের হোটেল আছে। সস্তা হোটেল, তবুও খাবারের দাম কম না। তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, কই, সব পঞ্চাশ টাকা প্লেট। রুই মাছ আছে আশি টাকা। মাংসের কথা জিজ্ঞেস করি নি। একটা খাবারও পছন্দ হচ্ছে না, কিন্তু দামে সস্তা না। ভাবলাম ইমারজেন্সি গেটে এসে গতকালের মতো পাউরুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে খেয়ে নিবো। তাও ভালো। কিন্তু আসার পথে হাসপাতালের ভেতরে  দুনম্বর গেটের পাশেই ডক্টরস ক্যান্টিনে চলে গেলাম। ক্যান্টিনে ভাত মাছ থাকলেও সাথে রুটি আছে। বড় সাইজের তন্দুর রুটি। দশ টাকা পিস। রুটির সাথে বাজি। বাজির দাম বেশি। বিশ টাকা। দুটো রুটিই নিলাম, বাজি নিলাম না। শুধু রুটি খেতে খারাপ না, বাজি কিনে অনর্থক বিশ টাকা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। এখানে গ্লাস হিসেবে পানির দাম দিতে হয় না। টাকা দিয়ে পানি কিনে খেলে, সে খাওয়ায় তৃষ্ণা মেটে না। ক্যান্টিনের পানিতে তৃষ্ণা মেটে। পেট অনেক খালি ছিলো। চার গ্লাস পানির জন্য টাকা গুনতে হলো না। চার টাকা বাঁচাতে পেরে খুব আনন্দ লাগছে। খাওয়া শেষ করে চিত্রা যেতে বলেছিলো। আমি ওকে আমার আনন্দ দেখাবো। চারগ্লাস পানির দাম বেঁচে যাওয়ার আনন্দ। মধ্যবিত্তের আনন্দ।

ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি চিত্রা আবার ঘুমিয়ে গেছে। আমার আসার পরই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিলো, সেটার প্রভাব। নার্স বললো, মধ্যরাতের আগে ঘুম ভাঙবে না।
চিত্রাকে আমার আনন্দ দেখাতে পারলাম না। কিন্তু ওকে ঠিকই মন ভরে দেখতে পারলাম। একটা ঘুমন্ত সুন্দর মানুষকে। ঘুমন্ত অবস্থায় যাদের সুন্দর দেখায়, তারাই সত্যিকারের সুন্দর। কারণ ঘুমন্ত মানুষের চেহারায় ছলছাতুরি কিংবা ভঙ্গিমা থাকে না।
সুন্দর জিনিসের খুব কাছে গিয়ে তা ছুঁতে না পারলে ভালো লাগে না। ছুঁয়ে ফেললেও আর মুগ্ধতা থাকে না। উভয়সংকট। আমি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাত আটটা বাজতে বাজতে চিত্রার ঘুম ভাঙবে না, তাই কাল সকালের আগে আর ওয়ার্ডে আসা হবে না। বেরিয়ে হাসপাতালের ভেতরে সময় কাটানোর মতো কোনো জায়গা পেলাম না। ঘুমের সমস্যার কারণে খালাম্মা অসুস্থ হয়ে গেছে। মেয়ের শাশুড়ি আর ননদকে রেখে দুপুরে বাসায় চলে গেছে। উনি থাকলে গতকালের মতো আজও বিকেলে একটু ঘুমানো যেতো। খালাম্মা পাশেই বসে থাকতো। আতঙ্কে থাকতো, যদি আবার গতকালের মতো ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে বসি। যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতাম উনি আমার মাথাতে হাত রাখতো। চুলগুলো নেড়েচেড়ে দিতো। আহা, মানুষ কতো দ্রুত কাছে এসে আপন হয়। আবার কেনো জানি দ্রুতই চলে যায়। দুদিনের স্বল্প সময়ে হাসপাতালে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে, সবাই চলে গেছে। হাসপাতাল থেকে যাওয়ার জায়গাও না। শোক, কান্না দেখতে একদম ভালো লাগে না। হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালের বহির্বিভাগের গেট দিয়ে বের হয়ে চলে এসেছি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দুপুরে বসেছি শহীদ মিনারে এসে, তখন রোদ ছিলো। এখন রোদ নেই। সূর্য ডুবে গেছে। চারপাশে মানুষজনের কমতি নেই। আশপাশ ঘিরে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও অনেকেই আসে এখানে। শহীদ মিনার সবার। ছাত্র, শিক্ষক দিনমজুর সবাই আসে। সামনে চায়ের দোকান আছে। গাভীর দুধের চা। দুপুরে তেমন একটা ভিড় ছিলো না। এখন ভিড় লেগে গেছে। প্রতিকাপ পাঁচ টাকা। দুপুর থেকে ছয় কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে। আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছি। হাফ হাতা গেঞ্জি গায়ে দেওয়া রোগা পাতলা একটা ছেলে চা দিয়ে যায়। আগে যতবার ডাক দিয়েছি, চা নিয়ে দৌড়ে এসেছে। এবারে সাত আট মিনিটের বেশি হয়ে গেছে আসছে না। দোকানের কাছে যেতেই ছেলেটা বললো,
‛ভাই এনেই খাইয়া যান। কাস্টমার বেশি, কাপ নিয়া দৌড়াদৌড়ি করতে পারমু না।’
এখানে বসার জায়গা নেই। দাঁড়িয়ে চা খেলে তৃপ্তি পুরে না। আমি বললাম,
‛ঠিকআছে, এখন লাগবে না। আমি ওখানেই বসি। কাস্টমার কমলে গিয়ে দিয়ে আইসো।’
চায়ের দোকানে যেতে আর আসতে এইটুকু সময়ের মধ্যে আমার আগের জায়গাটুকু দখল হয়ে গেছে। জায়গাটা এক কিনারে ছিলো নিরিবিলি। এখন আর নিরিবিলি নেই। একদল তরুণ তরুণী সেখানে গিটার নিয়ে বসেছে। কি সুন্দর গায়। আফসোস হচ্ছে; ইশ আমিও যদি গিটার হাতে থাকতাম ওদের দলে। যদি গলা মিলিয়ে গাইতে পারতাম;
‛আমরা ক'জন নবীন মাঝি
হল ধরেছি,
শক্ত হাতে রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পারি দেবো রে।’
আমি ওদের সাথে তাল মিলাই। আস্তে আস্তে গাই।
নিজের কণ্ঠস্বর নিজে শুনি। আনন্দ পাই।
হটাৎ পিছন থেকে পিঠে কার যেনো হাতের স্পর্শ,
‛ভাই আমনের চা।’
গানের মুড নষ্ট। চা খেতে খেতে গলা মেলানো যাবে না। তবে চা খেতে খেতে আরাম করে ওদেরটা শুনা যাবে। চায়ের নেশা খারাপ না। ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে কাপ নিয়ে যাবে হয়তো। জিজ্ঞেস করলাম,
‛এই তুই নিজে চা বানাতে পারিস?’
হাস্যোজ্জ্বল মুখে তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর।
‛হ, পারি তো। ওস্তাদ দুপুরে খাইতে গেলে আমিই তো তহন বানাই।’
ছেলেটার চেহারায় হাসি সুন্দর। চা বানাতে পারাটা ওর জন্য গর্বের ব্যাপার।
‛তাহলে তুই দুপুরে খেতে যাস না?’
‛না। ওস্তাদ বাড়ি থিকা খাবার নিয়ে আসে। আমি শহীদ মিনারে বইসা খাই।’
শহীদ মিনারে বসে ভাত খেতে কেমন লাগতে পারে। আমি জানি না। এখানে বসে চা খেতে কেমন লাগে সেটা আমি জানি। বললাম,
‛তুই তাহলে শহীদ মিনারে বসে ভাত খাওয়ার অনুভূতি কেমন তা জানিস। কিন্তু আমি যে চা খাচ্ছি এখানে বসে, সে অনুভুতি কেমন তা জানিস?  চা খাস মাঝে সাঝে এখানে বসে?’
এতক্ষন হাসিমুখে থাকা ছেলেটা হটাৎ কেমন চুপসে গেছে। উত্তর দিলো মাথা নেড়ে। একজন চা বিক্রেতা হয়তো প্রতিদিন তার চায়ের স্বাদ কেমন তাও জানে না। বললাম,
‛যা এককাপ নিয়ে আয়।’
সে যাবে না। চায়ের টাকা দিলাম, তাও আনবে না। ওস্তাদ নাকি মারবে। নিজেই দোকানে গিয়ে আগের কাপটা দিয়ে আরো দু কাপ চা আনলাম। কাউকে দূর থেকে ডেকে কাছে এনে বসালেই আপন লাগতে শুরু করে। আপন মানুষের ব্যাক্তিগত গল্প কেউ নিজের অজানা রাখতে চায় না। আমিও না। চা বিক্রেতার সহকারী হাফ হাতা গায়ে দেওয়া ছেলেটার গল্প শুনলাম। জীবন সুন্দর কিন্তু সহজ না। ভোর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দোকানে কাজ করে। দৈনিক একশো টাকা পায়। সাথে দুপুরের ডাল ভাত। একশো টাকায় পরিবারের  তেমন  কিছু হয় না। বাবা নাই, মায়ের সাথে আরো দুই বোনসহ সংসার চালানোতে সাহায্য করা, এই। এখানে বিশ্রামের তেমন সুযোগ হয় না। সোডিয়ামের বাতির নিচে শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে চা খাওয়ার অনিভুতি কেমন হয়, সেটা ও জানতো না। আজ জেনেছে। কাঁধে আমার হাতের স্পর্শে ভরসার জায়গা পেয়েছে। নিজের জীবনের গল্পটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছে।

একটু সামনে মোটামুটি বয়স্ক একটা লোক গল্প করছে। অনেকেই তাকে ঘিরে রেখেছে। নিজের সাফল্যের গল্প বলছে। প্রাইভেট টিউশনি করে ঢাকায় মোট ছয় কাঠা জায়গা কিনেছে। নিজের দুই ছেলে এবং এক মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও বাবার মতোই প্রফেশন বেছে নিয়েছে। বাসায় বাসায় গিয়ে টিউশনি করা। অনেকেই টিউশনি প্রফেশনটাকে ছোট করে দেখে। ছোট করে দেখে বলতে, কেউ টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করছে তো সে এখনো বেকারই রয়ে গেছে। এরকম ধারণাটা এতো সহজে তো আর আমাদের সমাজ থেকে মুছে দেওয়া যাবে না। তবুও এই ভদ্রলোক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরকে খানিকটা অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করছে। রুবির কথা খুব মনে পড়ছে। কাউকে শেখানোর চাইতে সুন্দর পেশা আর কিছুই হতে পারে না। যদিও টিউশনি আমার পেশা ছিলো না। বিকেলে একটু সময় পেতাম, তাই যেতাম। পড়াতাম, নিজেও আনন্দ পেতাম। টাকাটারও দরকার ছিলো, চিত্রার জন্মদিনের জন্য। রুবির মা যেদিন টাকাটা দিলেন, তার আট দিন পর চিত্রার জন্মদিন। টাকাটা পকেটেই রেখেছি। রোজ ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পথে কচুক্ষেত বাজারে যেতাম। বন্ধুর জন্য জন্মদিনের উপহার কি হতে পারে! আমি একটা নীল শাড়ির কথাই ভাবতাম সবসময়। নীল শাড়ি, চুড়ি প্রেমিকাকে দেওয়া যায়! বন্ধুকে দেওয়া যায় কিনা জানি না। রুপম বাবু কি ভাববেন, তাও বুঝতে পারছি না। তবুও শাড়ির চিন্তাটাই আমার মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। রোজ একটা একটা শাড়ি পছন্দ করতাম। একদিন একটা কিনেও ফেললাম। সোনালী চিকন পাড়ের নীল রঙের শাড়ি। এ শাড়ি চিত্রার পছন্দ হবে। সাথে নীল রেশমী চুড়ি পড়বে। কপালে টিপ, শাড়ির কালারের নেইলপলিশ। খোলা চুলে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। নেইলপলিশ টা নীল ছিলো না। ব্লু ছিলো। ব্লু নেইলপলিশ মেয়েদের অপছন্দ, আমি জানতাম না।

রুপম বাবু কেমন যেনো মনমরা থাকতেন। চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে তাই হয়তো। তবুও ছবি আকার কাজ পুরোদমে চলে। নারীমূর্তি এঁকেছেন। ছবির কম্পোজিশনটা এরকম; আলো আঁধারে কেউ একজন ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। গোধূলি পেরিয়ে গেছে। তবুও মেঘলা আকাশ দেখা যাচ্ছে। ছবি আকার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি ক্যানভাসের সামনে ছিলাম না। রাত জেগে এঁকেছেন। ছবির মানুষটাকেও চিনি না। চেনার কথা না। শুধু পেছনের দিকটা এঁকেছেন। ছবিতে হালকা ঝড় বাতাস বইছে। বাতাসে চুল উড়ছে। এ নারীমূর্তি চিত্রার হতে পারে না। চিত্রার চুল আমি চিনি, শরীরের গঠনও জানি। ছবির নিচে কিছু একটা লেখা আছে;
‛একই আকাশের নিচে বাঁচি দুজনে,
যেনো কোটি মাইল দুরত্ব মেপে মেপে।
প্রেমেরও কি তবে আয়ু ফুরায়,
হারিয়ে যায় দূর নক্ষত্রের দেশে?’
লেখার শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন! কাকে রুপম বাবু প্রশ্নটা করেছেন? অতি সাধারণ একটা ছবি, কিন্তু রহস্যময়।
বুঝতে পারলাম; যাকে এঁকেছেন, প্রশ্নটাও তাকেই করেছেন। কিন্তু ছবিটা কার?

স্টুডিওতে আমিও আছি, রুপম বাবু জানতেন না। খুব আগ্রহ নিয়ে ছবিটা দেখছেন। আমি পেছন থেকে বললাম,
‛আমাকে ছাড়াই ছবি আঁকলেন?’
পেছনে তাকিয়ে আতকে উঠলেন। মানুষটার চোখে জল! এই মানুষটাও কাঁদতে পারে আমি জানতাম না। এই প্রথম দেখলাম। আমি নিজেই সংকোচে পড়ে গেলাম। আমি চাইলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। কারণ রুপম বাবু চোখের জল লুকাতে একটু চেষ্টা করলেন না। গাল বেয়ে টপ টপ করে জল মেজেতে পড়ছে। যেনো এই স্টুডিও ঘরটাতে এখন বন্যা হবে। চোখের জলে বন্যা। সেই বন্যাতে আমিও ডুবে যাবো। অন্যের দুঃখের সাগরে মানুষ কখনো কখনো নিজেকেও ডুবিয়ে ফেলে। আমারও তাই করতে হচ্ছে। মানুষটার সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি একটু কাছে গিয়ে মেজেতে পা বিছিয়ে বসলাম। বললাম,
‛কার ছবি এঁকেছেন রুপম বাবু?’
আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবার ছবিটার দিকেই তাকালেন। নীরবতায় বোবা কান্নাও টের পাওয়া যায়। এভাবে নীরবতায় কান্না হয়তো আমার মধ্যেও এসে ভর করবে। নীরবতা ভেঙে আমিই আবার কথা বললাম।
‛মুখটা তো আঁকলেন না।’
আবার দেখলাম রুপম বাবুর করুন মুখখানা। বললেন,
‛মুখটা বাধা পরে গেছে মিহির। ঐ চোখ, ঠোঁট এঁকে ফেললে আবার ছুঁতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু ছুঁতে পারবো না আর, মানুষটা হারিয়ে গেছে।’
আমি বললাম,
‛যে কাছে আছে, তাকে কেনো ছুঁয়ে দেখেন না?’
রুপম বাবু ভেজা চোখেই হেসে দিলেন। বললেন,
‛কারো প্রতি প্রেম না থাকলে তাকে আর ছুঁতে ইচ্ছে করে না।’
আমি বললাম,
‛তাহলে পতিতালয়ে গিয়ে কি সবাই বেশ্যার প্রেমে পড়ে?’
রুপম বাবু আমার দিকে ঝুঁকে বসলেন। বললেন,
‛না, কেউ বেশ্যার প্রেমে পড়ে সঙ্গমে লিপ্ত হয় না। পতিতালয় নিতান্তই শারীরিক চাহিদা মেটানোর জায়গা। তেমনি অপ্রেমে বউয়ের কাছে গিয়ে শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা মেটালে বউকে কি তখন বেশ্যা মনে হয় না?’
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না। রুপম বাবু উত্তরের অপেক্ষাও করলেন না। স্টুডিও ছেড়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। আমি যে কথাটা বলতে এসেছিলাম, সেটা আর বলা হলো না। চিত্রার কাল জন্মদিন। ভেবেছিলাম রুপম বাবুকে নিয়ে আজ রাত বারোটায় উইশ করবো। কেক কাটার ব্যবস্থা করবো। চিত্রা নিশ্চয় খুব খুশি হবে। কিন্তু সেসব এখন হবে না। রুপম বাবু ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন। কি জানি, কাল চিত্রার জন্মদিন হয়তো উনি জানেনই না!

চিত্রা রাত বারোটা পর্যন্ত কখনোই জেগে থাকে না। কাল ওর জন্মদিন, নিজেও হয়তো খেয়াল রাখে নি। আমি রেখেছি। খুব যত্ন করে একটা উপহার সাজিয়েছি। চিত্রাকে ডাকবো ঠিক বারোটায়। কিন্তু রুপম বাবুর প্রশ্নটা মাথায় নড়াচড়া করছে বার বার। প্রশ্নটার উত্তর হবে হয়তো ‛হ্যাঁ’! নিজের বউকেও কখনো কখনো পতিতালয়ের নিশিকন্যার মতো লাগে। শরীর জাগলে নগ্নতায় কাছে টেনে নিবো। যেখানে গভীর যৌনি আর প্রস্ফুটিত স্তনের সাথেই প্রেম। সঙ্গমে প্রবল উত্তেজনায় দুফোঁটা জল খসে গেলেই শেষ। তারপর পাশ ফিরে শুয়ে থাকবো। কিন্তু শুধু যৌনতার লিপ্সা তো বেশ্যার শরীরেও মেটানো যায়। শুধু লিপ্সা মেটানোর জন্য বউয়ের কাছে গেলে বউ কেনো তখন বেশ্যা নয়? বিছানার বাইরেও তো মানুষের প্রেম দরকার হয়। যেখানে মানুষটাকে ছাড়া সব কিছু শূন্য লাগবে। কারণে অকারণে কাছে পেতে ইচ্ছে করবে। সারাক্ষন শরীরে শরীর লেপ্টে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করবে। কাজল চোখের চাহনিতে একটু খানি ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করবে। কপালে আলতো চুমুতে যৌনতা থাকবে না কিংবা ভোরের আলোয় ঠোঁটে নরম চুমুতে আবার রাতের সঙ্গমে ফিরতে ইচ্ছে করবে না। এইতো প্রেম! প্রেমহীন সংসারে যত্নের অভাববোধ হয়। গোপনে দূরত্ব বাড়ে। মানুষটার জন্মদিন পর্যন্ত মনে থাকে না!

জানালা খোলা। বাইরে জোৎস্না নেই, অমাবস্যা নিকটে। তবুও জানালা দিয়ে ঘরে আলো ঢুকে। লামপোস্টে জলে থাকা নিয়ন আলো। এই আলোতেই চিত্রাকে স্পষ্ট দেখা যায়। এলোমেলো চুল কিছুটা মুখের উপরে। চুলের ফাঁকে ঠোঁটগুলো রাতের আঁধারেও গোলাপি লাগে। ঘরে আলো জালাতেই চিত্রা নড়াচড়া দিয়ে উঠলো।
‛এই চিত্রা উঠো তাড়াতাড়ি।’
চোখ বন্ধ রেখেই কোলবালিশটা কাছে টানতে টানতে বললো,
‛উহু, উঠবো না। যাও তো, সকালে এসো।’
আমি বললাম,
‛আরে উঠে তো দেখো, এখনি সকাল।’
চিত্রা বালিশটা বুকে চেপে উঠে বসে চোখ খুললো। খানিকটা চারপাশে তাকিয়ে ঠোঁটদুটো একসাথে চেপে অনেকটা রাগ রাগ ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকালো। বললো,
‛এই পাজি। কই সকাল? আমাকে ঠকানো হলো হ্যাঁ?’
আমি সামনে গিয়ে খাটের উপর আমার দুহাতে ভর দিয়ে চিত্রার চোখে তাকিয়ে ঝুঁকলাম। বললাম,
‛আচ্ছা ঠকিয়েছি। কিন্তু এখনি জিতিয়ে দিবো। চোখ বন্ধ করো।’
চিত্রা মাথা উঁচু করে বললো,
‛কি করবে?’
আমি বললাম,
‛আগে তো চোখ বন্ধ করো।’
‛ঠিকআছে।’ বলে বাচ্চাদের মতো দুটো হাত দিয়ে দুই চোখ ডেকে দিলো।
চিত্রা হাতের আঙ্গুল ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করছে দেখে বললাম,
‛এই, ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কিন্তু, একদম দেখবা না।’
‛ঠিক আছে বাবা, কিন্তু তাড়াতাড়ি করো। আর চোখ বন্ধ রাখতে পারছি না।’ বলে হাত দুটো চোখ থেকে সরিয়ে ফেললো। আমি ততক্ষনে কেক আর ছুরিটা ওর সামনে রেখেছি। কেকের উপর একটা মোম।
চিত্রা চোখ খুলতেই ওর খুব কাছে আমার মুখটা নিয়ে খুব আস্তে করে বললাম,
‛শুভ জন্মদিন।’
চিত্রা যেনো হটাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে ফেলতে চাইলো। কিন্তু হাত দুটো সামনে এনে ও আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। একটু থেমে থেমে বললো,
‛দূর কি করছো। বন্ধুর জন্মদিনে এভাবে উইশ করতে হয় না।’
ছুরিটা ওর হাতে দিতে দিতে বললাম,
‛সে পরে দেখা যাবে। আগে তো কেকটা কাটো।’
চিত্রা ছুরির সাথে আমার হাতটাও চেপে ধরলো। মোমের দিকে ঝুঁকে ফুঁ দেওয়ার আগেই, নিঃশ্বাসে মোম নিভে গেলো। আমি তবুও বলতেই থাকলাম,
‛হ্যাপি বার্থডে টু য়‍্যূ। হ্যাপি বার্থডে টু য়‍্যূ ডেয়ার চিত্রা।’
চকলেট কেক মেয়েদের পছন্দ, আমার ভালো লাগে না। কেমন তেতো তেতো স্বাদ লাগে। চিত্রা যেইটুকু আমার মুখে দিয়েছে, শুধু সেটুকুই খেয়েছি। ও খেতে খেতে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট, মুখে কেক মেখে ফেলেছে। আমি পেছন থেকে বললাম,
‛শুনো না, আরেকবার তো চোখ বন্ধ করতে হবে।’
চিত্রা এবার বুঝে ফেলেছে। কেকের পিস মুখে দিতে দিতে বললো,
‛বোকা তুমি? খাচ্ছি দেখছো না? খাওয়া শেষ না করতে গিফট নিতে পারবো না।’
গিফটের প্যাকেটটা ওর সামনে রেখে বললাম,
‛দূর হলো না কিছুই। আগেই বুঝে ফেললা।’
‛বুঝেছি বেশ হয়েছে।’ বলেই হাতে লেগে থাকা কেক মুছতে মুছতে আমার সাদা গেঞ্জিটা নিমিষেই কালো করে দিলো। স্রেফ বাচ্চামি। এসবে আমারও খারাপ লাগে না। প্যাকেট খুলেই বললো,
‛এই ছেলে। হটাৎ এতো বাড়াবাড়ির কারণ কি হ্যাঁ?’
আমি বললাম,
‛এটা বুঝি বাড়াবাড়ি?’
বললো,
‛হু খুব বাড়াবাড়ি। তুমি এমন করলে আমি নিজেকে তবে কিভাবে সামলাবো?’
আমার বুকের ভেতর ধপ করে উঠলো। চিত্রা কেমন চাহনিতে কথাটা বললো। এ ইঙ্গিত আমার না বুঝে থাকার কথা না। আমি তবু কথা ঘুরলাম। বললাম,
‛এই, বাদ দাও তো। গিফট গুলো কেমন হয়েছে বলো।’
চিত্রা কেঁদে দেওয়ার মতো মুখ করে বললো,
‛একদম ভালো না, খুব পঁচা। আমি এগুলো কোনোদিনও পড়বো না।’
বলেই প্যাকেটটা একপাশে রেখে শুয়ে পড়লো। অভিমানী মুখটা ফিরিয়ে নেওয়ার আগে, চোখ গুলো দিয়ে কিছু একটা বলতে চাইলো। অভিমানে চোখের ভাষা বুঝা সবচেয়ে সহজ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ বুঝতে চায় না। আমি খুব সহজ ভঙ্গিতেই ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে চলে আসলাম। সারারাত আর একটানা ঘুম হলো না। একটু চোখ লেগে আসলেই, নীল শাড়িতে চিত্রা আমার স্বপ্নে আসে। স্বপ্নে কেনো চিত্রা আসবে! আমি সজ্ঞানে চিত্রাকে নিয়ে ভাবতে চাই না। কিন্তু অবচেতন মন সে বাধা মানে না। কেনো এমন হয়? এতো ভীষণ যন্ত্রনা।

এভাবে ঝন্ত্রনায় কেটে গেলো গোটা এক বসন্ত। চৈত্র যাচ্ছে বৈশাখ আসছে ঠিক এরকম সময়ে ঝড় আসলো। বৈশাখের ঝড়কে কালবৈশাখী বলি। চৈত্রের ঝরকে কি বলবো কালচৈত্রি? তখনো রাত বারোটা পার হয় নি। ঝড়ের নতুন নাম খুঁজতে খুঁজতেই চৈত্র পেরিয়ে বৈশাখ চলে আসলো। ঝড় পুরোপুরি থামলো গিয়ে শেষরাতে। রাত পোহালেই পয়লা বৈশাখ। বৈশাখ মাস শুরু হলো কালবৈশাখী ঝড় দিয়েই। ভোরের আলো ফুটতেই জানালা দিয়ে চোখে পড়ে বাইরে উৎসবমুখর পরিবেশ। বাসায় পান্তা ইলিশ কিছুই রান্না হলো না। ইলিশ মাছে রুপম বাবুর এলার্জি আছে। সেকারণে বাসায় কখনো ইলিশ কেনা হয় না। দুপুরে সাধারণ রান্না বান্না। খেয়ে রুপম বাবু দরজা লাগিয়ে ঘুমোচ্ছে। আমারও কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো। হটাৎ কানে আসে চিত্রার ঘরে গুন গুন গানের আওয়াজ।
‛যখন শিমুল পলাশ ঝরবে পথে
দুলবে হওয়া বুকে,
থাকবো দুজন দুজনাতে
শপথ নিয়ে সুখে।
গাইবো তোরই দৃষ্টিপানে
এক সুরেরই গান।

টাপুর টুপুর বৃষ্টি নুপুর
জল ছবিরই গায়,
তুই যে আমার একলা আকাশ
মেঠো সুরের ছায়, রে
মেঠো সুরের ছায়।’
চিত্রার ঘরে ঢুকতেই গান থামিয়ে দিলো। নেইলপলিশ দিচ্ছিলো। বললো,
‛ব্লু নেইলপলিশ কেউ কিনে?’
আমি জবাব কি দিবো, তাকিয়ে থেকেই কুল পাই না। চিত্রা নীল শাড়িটা পড়েছে। সাথে নীল রেশমী চুড়ি। কপালে মাঝারি আকারের নীল টিপ। ঠোঁটে গোলাপি লিপিস্টিক, কিন্তু একদমই দরকার ছিলো না। নেইলপালিশ রেখে শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে বললো,
‛চুড়ি গুলোও কিনেছো বড় সাইজের। কিচ্ছু পারো না তুমি।’
আমাকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,
‛আরে, শাড়ির কুঁচিটা তো ঠিক করে দাও। নাকি এটাও পারো না?’
আমি একদম কাছে গিয়ে বললাম,
‛আমি কিচ্ছু পারি না।’
চিত্রা বিরক্তির চাহনিতে তাকিয়ে আমার হাতটা ধরলো।
‛দূর ছাই। ধরো তো আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।’ বলেই আমার হাতটা শাড়ির কুঁচিতে রাখলো। খুব আগ্রহ নিয়ে শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করলাম। উপরের দিকে চিত্রার চোখে তাকিয়ে বললাম,
‛যাবে টা কোথায়?’
আমার চুল ধরে টান মারতেই দাঁড়িয়ে গেলাম। বললো,
‛টেনেটুনে তোমাকে ছাদের বাইরে তো আর নিয়ে যাওয়া যায় না। ছাদেই যাবো চলো।’
এতক্ষনে বুঝলাম, চিত্রা আমার জন্যই এতো যত্ন করে সেজেছে। ইচ্ছে করছে বাইরে থেকে চিত্রাকে নিয়ে ঘুরে আসি। কিন্তু তাতে বিপদ আছে। প্রতিদিন বের হতে চাইবে। এমনিতেই প্রতিদিন বিকেলে বলে বের হবে, আমি ছাদ পর্যন্ত আসি। এর বাইরে ওকে নিয়ে বের হই না। হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে আসলো। একটাও অন্য মানুষ নেই। সবাই মেলায় ঘুরতে গেছে হয়তো। বললাম,
‛কেউ নাই খেয়াল করছো?’
‛হু ভালোই হলো। দুজনে আকাশ দেখি চলো।’
‛না আকাশ দেখবো না। আবার যদি তোমাকে ভেবে ফেলি?’
‛আরে ভাবতে থাকো না। বন্ধুই তো।’
‛বন্ধুকে ভাবা যায় বুঝি?’
‛শুধু ভাবাই যায় না, চাইলে!’ চিত্রা চুপ হয়ে যায় হটাৎ। আমি বলি,
‛চাইলে কি?’
চিত্রা কিছু না বলে আরো সামনে আসতে থাকে।
ছাদে বাতাস আছে। চুল উড়ে ওর মুখ ঢেকে দিতে চাইছে। চুলের গন্ধ কি বাতাসে ভাসে? নাকি কাছে আসার বাহানা! বুকে উত্তাল ঢেউ। মনে হয় প্রাচীর ভেঙে দূরত্ব ঘুচিয়ে নিবে। এ কেমন বিপদ! পহেলা ফাল্গুনে করা সেই ভুল আবার কেনো হবে! এতে আমার কোনো হাত নেই, না হাত আছে চিত্রার। এ প্রকৃতির নিয়ম। প্রেম আসে নিয়মে, অবচেতন মনে। লড়াই করার উপায় নেই, দুপক্ষ থেকে আসা প্রেম হার মানে না। হটাৎ হুঁশ হতে দেখি, চিত্রার নরম ঠোঁটে আমার ঠোঁট লাগানো। আমার গালে ওর হাত। তার মানে পাগলামিটা চিত্রার ছিলো। কেনো একই ভুল আবার হলো?
আমি হটাৎ পেছনে সরে গেলাম। বললাম,
‛আবার এটা কি হলো?’
চিত্রা খানিকক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। পরাজিত কণ্ঠে বললো,
‛আমিই আর পারলাম না মিহির। কেমন জেনো হেরে গেলাম। আবার প্রেমে পড়লাম!’
আমি আর কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে চিত্রার জুতোর শব্দ আমার কানে ভাসে। আমি কিছু ভেবে পাই না। এ কেমন প্রেম? দেয়াল মানে না? বাধা মানে না? এতো বড় প্রাচীর চোখে পড়ে না? প্রেম এমনও হয়? জানি না তো! কেনো এমন হয়?
আমার প্রশ্নের উত্তর কেউ দিবে না। প্রেমে পড়ার কোনো কারণ থাকতে হয় না।


হেসে আমার সকল মন খারাপ শূন্যে মিলিয়ে দেওয়ার মতো অসাধারণ ক্ষমতা চিত্রা সবসময় রাখতো। সে কারণে ওর দাঁতগুলোই বেশিরভাগ সময়ে আমার চোখে ভাসতো। কি সুন্দর দাঁত বের করে হাসে। আমি দাঁতগুলো নিয়ে গবেষণা করতে চাইতাম। আমার সাথে কি ভীষণ মিলও পেতাম। উপরের দাঁতে মাঝখান থেকে ঠিক এক নম্বর আর দু নম্বর দাঁতের মাঝখানে একটা ফাঁকা আছে। চিত্রার হাসিতে এই ফাঁকাটা স্পষ্ট ভাবে চোখে পড়ে। একই জায়গায় ফাঁকা আমার দাঁতেও আছে। কি জানি, চিত্রারও হয়তো সেটা চোখে পড়ে।

চিত্রা হাসছে। দাঁত বের করে হাসছে। আমি কি আর মন খারাপ করে থাকতে পারি? মার মন খারাপের কারণ; রাত প্রায় দশটা অথচ, এখন পর্যন্ত জানতে পারছি না পরের দিন ঈদ হবে কিনা। সন্ধ্যার আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখলেই নিশ্চিত হতে পারতাম কালকে ঈদ হবে। সন্ধা বেলা ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম চাঁদ দেখতে। সাথে চিত্রাও ছিলো। আমাদের ছাদ সহ আশেপাশের সব ছাদেই ছোট বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ, সবার ভিড়। অনেকে আতশবাজি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ আকাশে ফানুস উড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবার একটাই অপেক্ষা; শাওয়াল মাসের চাঁদের দেখা। তারপর প্রতিটা ছাদে শুরু হবে চাঁদ দেখা উৎসব। বাজি ফুটবে, আকাশে ফানুস উড়বে। চিত্রা আগ্রহ নিয়ে এসেছে ছাদে আমার সাথে। সন্ধ্যা বেলা তাই সাথে আনতে চাই নি। কিন্তু এমনভাবে বললো;
‛চাঁদ না দেখলে আমি কি করে তোমার সাথে ঈদ করবো?’
আমি বললাম,
‛আরে চাঁদ না দেখলেও তো ঈদ হবে। বেশি ইচ্ছে হলে তুমি বসে টিভিতে চাঁদ দেখো।’
তবুও মানলো না। রুপম বাবু সোফায় বসে টিভি দেখছিলেন। উনার সামনেই হাত ধরে আমাকে আটকে রাখলো, ছেড়ে ছাদে যেতে দিবে না। শেষে আমিই বেঁকে বসলাম। বললাম,
‛ঠিকআছে, ছাড়ো। সবাই একসাথে টিভিতেই চাঁদ দেখি চলো, ছাদে যাবো না।’
আমিও সোফায় গিয়ে বসে পড়লাম। চিত্রাই এবার আমার হাত ধরে টানতে শুরু করলো। বললো,
‛বলেছো না একবার ছাদে যাবে? এখন যেতেই হবে।’
চিত্রার ছেলেমানুষি দেখে রুপম বাবু লজ্জায় পড়ে গেলেন। বললেন,
‛মিহির যাও তো ছাদে। তুমি না নিয়ে গেলে পরে দেখবা একাই চলে গেছে।’
আমি জানি চিত্রা একা যেতে চাচ্ছে না। চাঁদ দেখুক আর না দেখুক, ওর শুধু আমাকে নিয়ে ছাদে যাওয়ার বাহানা। সোফা ছেড়ে উঠলাম। চিত্রা একেবারে ছাদে উঠে আমার হাত ছাড়লো। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো, তবুও চাঁদের দেখা মিললো না। কেউ কেউ যত্ন করে আতশবাজি গুছিয়ে নিচে নেমে গেলো। কাল চাঁদ উঠলে তখন ফুটাবে। কয়েকজন বিষণ্ণ মনেই আকাশে ফানুস উড়িয়ে দিলো। বাচ্চারা চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করলো না। বৃদ্ধরা অনেকে শুকরিয়া আদায় করলো; এবার ত্রিশটা রোজা রাখতে পারবে। চিত্রার তবুও আনন্দ; কাল সন্ধ্যায় আবার ছাদে উঠে চাঁদ দেখা উৎসবে মেতে উঠবে। বললো,
‛তুমি কিন্তু কালকে বাজি কিনে আনবে। চাঁদ উঠুক না উঠুক, আমরা কালকে বাজি ফুটাবো।’
আমি হেসে দিলাম। বললাম,
‛বাজি ফুটাও আর না ফুটাও, কাল তো চাঁদ উঠবেই।’
চিত্রা ঠিকঠাক জবাব পায় নি। বাজি কেনার কথা উড়িয়ে দিয়েছি। রেগে গেছে সেজন্য। নিচে নামবে না। শেষে আমিই হাত ধরে টানতে টানতে নিচে নামালাম। বাসায় ঢুকতেই রুপম বাবু বললেন,
‛মিহির, চাঁদ তো উঠেছে খবরে বললো।’
‛কই, দেখি।’ বলে চিত্রা দৌড়ে গেলো টিভির সামনে। আমিও গেলাম। দেশের উত্তরাঞ্চলে কারা নাকি চাঁদ দেখেছে। তবে চাঁদ দেখা কমিটি এখনো সিদ্বান্ত জানায় নি। চিত্রা বললো,
‛দূর। চাঁদ আজকে না উঠলেই ভালো। কাল আবার মজা হবে ছাদে।’
আমারও হটাৎ মনে হলো, আজ চাঁদ না উঠলেই ভালো। কাল সত্যিই বাজি কিনে আনবো। সাথে একটা ফানুসও। চাঁদ উঠবে অবধারিত জেনে কেউ ছাদে উঠুক না উঠুক, আমরা উঠবো। চিত্রাকে সাথে নিয়ে আকাশে ফানুস উড়াবো। চিত্রা পুরো আকাশটাকে তখন নিজের ভেবে নিবে। দু হাত শূন্যে মেলে দিবে। চিৎকার জুড়ে দিয়ে আকাশে উড়তে চাইবে। যেখানেই উড়ে যাক, আমাকে নিশ্চয় সঙ্গে নিতে চাইবে!

‛হা করে কি দেখছো?’ বলেই চিত্রা হাসি থামিয়ে সামনে আসলো। বললাম,
‛কিছু না বলে শুধু হাসছো যে, তাই দেখছি।’
চিত্রা দাঁড়িয়েই আছে। হাসি পুরোপুরি মুছে যায় নি ঠোঁট থেকে। বললো,
‛এমন করে তাকিয়ে আছো, ভাবলাম কবিতা টাইপের কিছু একটা ভাবছো।’
চিত্রার চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বললাম,
‛দূর কিছুই আর ভাবতে পারছি না। কবিতা সব দেখি পালিয়েছে গিয়ে তোমার চোখে।’
চিত্রা থেমে গেলো। একদম স্তব্ধ দাঁড়িয়ে। মুখের হাসিটা যেনো চিরতরে মুছে গেছে। খানিকবাদে এগিয়ে আসলো ধীরে ধীরে। তারপর খুব আস্তে তবে স্পষ্ট স্বরে বললো,
‛তাহলে লিখে ফেলো তোমার আমার সবটা চোখের ভাষা কবিতায়।’
আরো বেশি কাছে আসার পর, চিত্রার চাহনিটা বেশি ভয়ংকর। কোনো ঝড় আসছে হয়তো হৃদপিন্ডে। স্পর্শে এইবার সত্যি মরে যাবো। আমি ওর গোলাপি ঠোঁট থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। নিজের ভেতরকার ঝড় থামালাম পেছনে সরে গিয়ে। আমাকে সরতে দেখে চিত্রা সংকোচে পরে গেলো। বললো,
‛যেটা বলতে আসছিলাম, চাঁদ নাকি সত্যিই উঠেছে দেখলাম।’
‛কই দেখে আসি তো।’ বলে চিত্রার পিছু পিছু গেলাম টিভির সামনে। চাঁদ দেখা কমিটি জানিয়ে দিয়েছে কাল ঈদ হবে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ ঈদ হয়ে গেছে সেটাও একটা বড় কারণ হয়তো। তবুও দেশের মানচিত্রে কোথাও নাকি গুটিকয়েক মানুষ একসাথে চাঁদ দেখতে পেয়েছে। প্রথমবার ঈদের চাঁদ দেখতে চেয়ে, ইচ্ছে পূরণ হলো না চিত্রার। মন খারাপ হওয়ার কথা হলেও খবরটা পেয়ে চিত্রা খুশিতেই ছিলো। সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চাঁদ দেখা কমিটির এমন অদ্ভুত কর্মকান্ডে এতক্ষন হেসেছে। নিজের ধর্ম নিয়ে ওর মাথা ব্যাথা নেই; বন্ধুর সাথে বাসায় ঈদ আয়োজন করবে।

ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঘরের বাতি নেভাতে গেলে একটা শপিং ব্যাগ হাতে চিত্রা আবার আসে। ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে বললো,
‛একটু ভোরে ঘুম থেকে উঠো। এখানে আটটা বাজে ঈদের নামাজ হবে বললো।’
চিত্রা কেমন বেশি কথা বলতে চাইলো না। আমি বললাম,
‛এভাবে বলে চলে গেলে আমি তোমার ব্যাগের এসব কিছুই নিবো না।’
‛আমি খুব ভালোবেসে কিনেছি এসব তোমার জন্য।’ বলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। ব্যাগে নীল পাঞ্জাবির সাথে সাদা পায়জামা। সাদা টুপি আর নীল বেল্টের স্যান্ডেল। ব্যাগের উপরের পৃষ্টে বড় করে লেখা ‛ঈদ উপহার’। মনে হলো এই উপহারে চিত্রার দেওয়া অনেক বেশি ভালোবাসা মিশে আছে।

খুব সকালে উঠতে পারি নি ঘুম থেকে। চিত্রাই এসে জাগিয়েছে। চিত্রা কিভাবে এতো সকালে উঠলো, সেটাই আমার কাছে বেশি অবাক লাগলো। মাথার চুল টানতে টানতে বললো,
‛তোমার ঈদ টাও কি আমাকে দিয়ে করাবা নাকি?’
চোখ খুলে দেখি চিত্রা বিছানায় বসে আমার চুল টানছে। চুল টানলো জোরে। বিরক্ত হয়ে বললাম,
‛দূর, ছাড়ো তো। ব্যাথা লাগে।’
চুল ছেড়ে চিত্রা হাত রাখলো কপালে। বললো,
‛যে কাছে আসতে চায় না, তাকে ব্যাথা দেওয়াতেই বেশি মানায় বুঝলে?’
বুঝলাম, রাতে চিত্রাকে দূরে সরিয়ে দেওয়াতে এখন ওর মনে এখন কিছুটা অভিমান বাসা বেঁধেছে। এই অভিমান দূরীকরণের সিস্টেমে দেয়াল তোলা আছে। তবুও চেষ্টা করলাম। বললাম,
‛তো কিভাবে আসবো কাছে শুনি?’
সুযোগ পেয়ে চিত্রা আরো বেশি গাল ফুলালো। অভিমানী কণ্ঠে বললো,
‛আর কাছে আসতে হবে না। কক্ষনো না।’ বলেই উঠে পড়লো। চলে যেতে চাইলে আমি হাত ধরলাম। হাত টান মারতেই ও আমার দিকে ঝুঁকে গেলো। বললাম,
‛ঈদের দিন আজ। মিষ্টি মুখ করাবে না?’
বুঝতে পেরে চিত্রা পেছনে সরে গেলো। বললো,
‛এই না, ছাড়ো। ঠোঁটের স্বাদ একদম মিষ্টি হয় না।’
চিত্রা তবুও হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলো না। আমিই ছেড়ে দিলাম। ওর ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠতেই আমার মন শান্ত হলো। বললাম,
‛ঠিকআছে, আমি একটা মিষ্টি স্বাদের লিপিস্টিক কিনে আনবো।’
লজ্জা পেয়ে চিত্রা দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো। লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বললো,
‛এই পাজি, চুপ।’ তারপর ঘর থেকে এক দৌড়। ছেলেমানুষি বটে। আমিই কেমন ভুলটা করলাম। চিত্রাকে আরো বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেললাম। সামনে কি ভীষণ ঝড় আসছে। সেই ঝরে সবার আগে হয়তো রুপম বাবুই উড়ে যাবেন। তিনি ইচ্ছে করেই উড়ে যেতে চাইছেন নাতো? কলকাতায় অনেকটা সময় ধরে প্রেম করেছেন অনন্যা সেনের সাথে। চিত্রার এসব পরিবর্তন তার না বুঝে থাকার কথা না। নিজের মানুষটা অন্য কারো প্রেমে পড়লে, চট করে বুঝে ফেলা যায়। চিত্রার ছেলেমানুষি সবই তার চোখে পড়ে। তবুও কিছু বলছেন না। আড়ালে চিত্রার সাথে আরো বেশি দূরত্ব মাপছেন। একদম নিজের মতো করে থাকছেন। দূরত্ব চিত্রাও বুঝে নিয়েছে। আমাকে শেকড়ের মতো করে আঁকড়ে ধরেছে। আমি আর কই যাই? ভেতরে ভেতরে নিজের যন্ত্রনা বাড়ছে।

দুটো আলাদা ধর্মের লোক এ বাসায় বসবাস করে, অথচ কেউ বুঝতে পারবে না। চিত্রা একটাবারের জন্যও বুঝতে দিলো না, ঈদ টা শুধু আমার! নিজে নতুন শাড়ি পড়েছে। গোলাপি রঙের জর্জেট শাড়ি। সাথে আকাশি কালারের ব্লাউজ। কোমর অব্দি চুল ছেড়ে রেখেছে। আমার মনে হলো চুল গুলো খোঁপা বাঁধা থাকলে ভালো হতো। খোঁপায় একটা রক্ত জবা গেঁথে দিতাম। রক্তজবা আমার ভীষণ প্রিয়; যেমনটা চিত্রা! কাছে আসতেই বললাম,
‛আজ কিন্তু বেশি সুন্দর লাগছে।’
চিত্রা নিজের দিকেই নিচে তাকালো। বললো,
‛রোজই তো বলো সুন্দর লাগছে। আজ একটু স্পেশাল করে বলো না?’
আমার সত্যিই স্পেশাল করে কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করলো। প্রতিনিয়ত নিজের মধ্যে ঝড় বয়ে যায়। চিত্রা কাছে আসলে এখন হৃদপিন্ড অনবরত কাঁপে। কিছুটা কন্ঠস্বরও। কাঁপা কণ্ঠস্বরে কবিতা কেমন শুনায় আমি জানি না। আমার শুধু কয়টা লাইন মাথায় এলো;
‛এই মুগ্ধ পিপাসু ঠোঁট আর
জলপ্রপাতের মতো দেখতে লাগা আঁখিতে;
শিমুল তুলোর মতো সুন্দর তুমি
যখনি সামনে আসো শাড়িতে,
ধুলোমাখা বিস্তৃন্ন শহরে
জোৎস্না আসে তোমার হাসিতে।’
চিত্রা সত্যিই হাসছে। আমি জোৎস্না দেখি সে হাসিতে। কি অদ্ভুত! এখনো দুপুর পেরোয় নি, সূর্য মাথার উপরে।জোৎস্না কি করে আসবে এই ভরদুপুরে! এই মানুষটা কারণে অকারণে হাসতে পারে। বললো,
‛বাহ! সুন্দর তো। তাহলে জোৎস্না দেখতে বাইরে যাও কেনো তুমি, হ্যাঁ? আমিই হাসবো আর তুমি আমাকে দেখবে।’
আমিও কেমন বলে ফেললাম,
‛তোমাকে তো পাই না রাত দুপুরে, যখন আমার খুব চাই।’
কথাটা গভীর ভাবে ভেবে বলি নি, তাও চিত্রা কেমন করে তাকালো। এ কেমন সংকোচ! সংকোচ কাটাতে কথায় মোড় ঘুরালাম। ডাইনিংয়ের দিকে যেতে যেতে বললাম,
‛নামাজ পড়ে হেঁটে হেঁটে এসেছি রোদ্রে। আগে তো কিছু দাও খেতে।’
চিত্রা সামনে এসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। বললো,
‛আলসেমি লাগছে। যা রান্না করছি সব টেবিলে। তুমি একটু নিয়ে নিয়ে খাও।’
একদম বাঙালি ঈদের রান্না। খিচুড়ি আর গরুর মাংস! চিত্রা, রুপম বাবু কেউই গরুর মাংস খায় না। তবুও বাসায় এ রান্না। আমার প্রিয় এ খাবারটার কথা চিত্রাকে কখনো বলি নি। তবুও কোথা থেকে যেনো শিখেছে ঈদে মুসলমানদের বাড়িতে এসব রান্না হয়। আমি খাই আর চিত্রা মুচকি হাসে। বলে,
‛রান্না কেমন হইছে?’
যা সত্যি তাই বললাম,
‛দুটোতেই লবন বেশি হইছে।’
চিত্রা নিজের উপর বিরক্তি প্রকাশ করলো। বললো,
‛দূর। লবণ ঠিকমতো দিতে পারলে সেদিনই নিজেকে রাঁধুনি ভাববো।’
হাসি থেকে গাম্ভীর্যে ফিরতে চিত্রার বেশিক্ষন লাগে না। নিজের ঘরে চলে গেলো। খেতে খারাপ না। লবণ বেশি হলেও এইটুকুতে আমি অভ্যস্ত। চিত্রাকে রান্নার প্রশংসা করা হলো না। এই কারণে পরের রান্না গুলো আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রশংসা না পেলে মানুষ যেকোনো কাজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। রুপম বাবু এসে শুধু খিচুড়ি খেলেন। লবণের কথাটা একবারও তুললেন না। কি সুন্দর মানুষ। জগতে এই মানুষটাই হয়তো কোনো অভিযোগ করতে জানেন না।

রুপম বাবু ছবি আঁকতে বসলেন বিকেলে। আমি পাঞ্জাবি পায়জামা খুলে লুঙ্গি পরে বসেছি স্টুডিওতে। অনেকদিন পর রুপম বাবুকে ছবি আঁকায় সাহায্য করতে বসলাম। প্লেটে রঙ গোলাতে গিয়ে খেয়াল করলাম, রুপম বাবু আগের থেকে বেশি চুপচাপ হয়ে গেছেন। আগে আমি স্টুডিওতে আসলে কি সুন্দর গল্প করতেন। ছবির পটভূমি আঁকতে গেলে আমার কাছ থেকে আইডিয়া নিতেন। আমার শৈশব নিয়ে গল্প করতে গেলে সেসবের ছবি ক্যানভাসে এঁকে দিতেন। আমি ছবিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি। রুপম বাবু কখনো বিক্রি করতে চাইলে দিয়ে দিবো। একজনের সৃষ্টিতে অন্যজনের অধিকার থাকতে পারে না।
ছবির কম্পোজিশন এখনো বুঝতে পারছি না। হলুদ চড়াচ্ছিলেন ক্যানভাসে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‛এবারের একজিবিশনে কোন কোন ছবিগুলো জমা দিবেন রুপম বাবু?’
ক্যানভাসে তুলির আঁচড় থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‛বাংলাদেশে এসে যা এঁকেছি, সব এবারের একজিবিশনে জমা দিয়ে দেবো। বিক্রি না হলেও ওখানেই পড়ে থাকবে।’
এতোদিনের আঁকা ছবিগুলোর উপর কেমন তাচ্ছিল্য করে কথাগুলো বললেন। আঁকার সময় আমি নিজেও ছবিগুলোর সাথে ছিলাম। আমার খুব গায়ে লাগলো। বললাম,
‛এই ছবিগুলোর প্রতি এতো অনীহা কেনো আপনার?’
এবার আর পেছনে তাকালেন না। আগের মতোই হলুদ চড়াচ্ছিলেন ক্যানভাসে। বললেন,
‛আর্ট স্কুলে ম্যাডামরা যখন তুলি ধরতে শেখাতেন, তখন এই ধরনের ছবির কম্পোজিশন দিয়ে দিতেন আঁকতে। আমি আজও সেসবই আঁকছি। যা আঁকছি, এসব আমার মুখস্ত বিদ্যার একটা অংশ। যেদিন এই মুখস্ত সিস্টেমের বাইরে গিয়ে কিছু আঁকতে পারবো, সেদিন নিজেকে শিল্পী ভাববো।’
আমি রুপম বাবুর কাঁধে গিয়ে হাত রাখলাম। বললাম,
‛রুপম বাবু আমি চলে যাবো। আপনি চিত্রাকে আঁকেন।’
রুপম বাবু কেমন হাসিতেই উড়িয়ে দিলেন কথাটা। বললেন,
‛আরে মিহির। কি বলছো তুমি। অনন্যা কে রেখে এসেছি, অনন্যা ভালো আছে। চিত্রাকেও রেখে যাবো, চিত্রা ভালো থাকবে। দূরে থেকে ভালো রাখতে পারলে, আমি আবার দূরেই যাবো।’
রুপম বাবু সত্যিই দূরে যেতে চাইলেন। আমার হাতটা ওনার কাঁধ থেকে সরিয়ে স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
আমি চিত্রার ঘরে গেলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে টিপ দিচ্ছে। কি আগ্রহ নিয়ে নিজেকে দেখছে। কতো কতো প্রেম ওর চোখে! যা আমি দেখি রুপম বাবু দেখেন না। আমি কাছে গেলাম। আয়নায় চিত্রাকে দেখলাম। অপলক তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। চোখ ফেরালেই যেনো জলপ্রপাত থেমে যাবে। এমন সুন্দর চোখ আর কখনো দেখা হবে না। চিত্রা তবুও মুখ লুকাতে চায়। আমি বলি,
‛কাদঁছিলে কেনো?’
চিত্রা হকচকিয়ে যায়। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলে,
‛কই নাতো।’
আমি আরো কাছে গিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেই গালে। চোখের জলের ছাপ রয়ে গেছে যেখানে। বলি,
‛প্রেমই তো লুকাতে পারলে না আমার কাছে। এখন কেনো কান্না লুকাবে বলো? কাঁদলে ইচ্ছে হলে আমার বুকেই কাঁদো না?’
চিত্রা চেয়েছিলো হয়তো এটাই। শিশুসুলভ আচরণ তো বটেই। বুকে আমার শার্ট ভিজে যায় চিত্রার চোখের জলে। বলে,
‛আমি তোমার থাকবো তো?’
এতো কাছ থেকে জড়ানো মায়া মেশানো কান্নায় উত্তর শুধু এইটুকুই দিতে পেরেছিলাম;
‛আমি জানি না চিত্রা। বেখেয়ালি প্রেমিক হয়েছি আমি। পৃথিবী আমায় মেনে নিবে না!’


চারুকলা অনুষদে রুপম বাবুর চাকরির মেয়াদ শেষ। বাসাতেই থাকেন সারাদিন, কিন্তু চুপচাপ। একদিন সন্ধ্যায় ডাকলেন চিত্রাকে। বললেন,
‛ভাবছি আবার কলকাতায় চলে যাবো।’
চিত্রা নির্বিকার ভঙ্গিতে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। পরে বললো,
‛তো যাও, শুভকামনা রইলো। তুমি তো শিল্পী হতে চেয়েছিলে, একদিন ঠিক বড় শিল্পী হবে।’
রুপম বাবু যেনো খানিকটা অবাক হলেন। বললেন,
‛তুমি যাবে না?’
চিত্রা আগের মতোই দাঁড়িয়ে। বললো,
‛তোমার জন্য একবার দেশ ছেড়েছি, পরিবার ছেড়েছি। সেটা ভুল ছিলো। আবার তোমার জন্য মিহিরকে ছাড়লে, সেটা আরো বড় ভুল হবে। আমি ভালোবাসি মিহিরকে!’
তারপর নীরবতা। চারপাশ স্তব্ধ। স্টুডিওতে আমি চিত্রার ঠিক পাশে চেয়ারে বসে। রুপম বাবু চোখ সরালেন না আমার চোখ থেকে। আমার নিজেকে অপরাধী মনে হলো। কিন্তু আমার ভুল রুপম বাবু ভেঙে দিলেন। উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়াতে আমিও উঠে পড়লাম। আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন,
‛চিত্রাকে আমি তোমার কাছে রেখে যাবো মিহির। চিত্রা ভালো থাকবে।’
আমি ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রুপম বাবু লাইব্রেরি ঘরটাতে চলে গেলেন। চিত্রার দিকে তাকালাম। চিত্রা হয়তো সত্যিই ভালো থাকবে। কিন্তু রুপম বাবু কেমন থাকবেন?

গন্তব্যে পা বাড়ালে যাত্রা শুরুর পথে দুরত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু দুরত্ব যতই বাড়ুক, গন্তব্যে পৌঁছে মানুষ যাত্রা শুরুর কথা ঠিকই মনে রাখে। চিত্রা রুপম বাবুকে একদমই অবজ্ঞা করে নি। সবসময় ছেড়ে যাওয়া মানেই অবহেলা কিংবা প্রতারণা নয়। ছেড়ে গিয়েও কখনো কখনো পাওয়া যায় আত্মউপলব্দির স্বাদ, মুক্তির ঘ্রাণ। গন্তব্য যদি আমি হই, চিত্রার সেখানে মুক্তি। কিন্তু রুপম বাবুর উপর চিত্রার একদমই কোনো রাগ ছিলো না। যেখানে চিত্রার যাত্রা শুরু। আমি কখনো দেখি নি, চিত্রা এই মানুষটাকে অসম্মান করেছে কিংবা ঘৃণা করার চেষ্টা করেছে। বনিবনা হয়নি বলেই মানুষটার জন্য বুকের ভেতর ঘৃণার চাষাবাদ শুরু করতে হবে তা কিন্তু নয়। থাকুক না কিছু বুক কিছু মানুষের জন্য অনাবাদি। যেখানে না হবে ভালোবাসার চাষ, না হবে ঘৃণার চাষ। দূরত্ব বাড়লেও সম্মান টা থাকুক। ভুল রাস্তায় ভুল করে দেখা হলেও কেউ মুখ ফিরিয়ে না নেক। রুপম বাবু একদিন ঠিক চলে গেলেন। আমি একজন স্রষ্টাকে হারালাম, যার সৃষ্টিতেও আমার কোনো অধিকার ছিলো না। নিয়ে গেছেন ক্যানভাসে আঁকা আমার সবটুকু শৈশব, আমার ছেলেবেলা!
একই প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া আরেকটা ছবি রেখে গেছেন,
‛প্রেমেরও কি তবে আয়ু ফুরায়, হারিয়ে যায় দূর নক্ষত্রের দেশে?’
যাওয়ার আগে রুপম বাবু চিত্রার ছবি আঁকতে পেরেছিলেন!

রুপম বাবুর চলে যাওয়াতে আমি একটুও অবাক হই নি। এরকমটা হয়তো হবারই ছিলো। রুপম বাবুর যেখানে শেষ, আমার সেখান থেকেই শুরু! পাইসা বিলে গিয়ে শাপলা কুড়ানোর কথা খুব মনে পড়ে। চাইলেই ডিঙি নৌকায় কোনো তরুণীকে উঠিয়ে একটা শাপলা ছিড়ে খোঁপায় গুঁজে দিতে পারতাম। তা কখনো করি নি। বিলে তরুণীদের থেকে চোখ ফিরিয়ে পদ্মপাতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। পদ্মপাতায় শিশির ফোটা আটকে রাখা দায়। আমার জীবন ছিলো জলে ভাসা পদ্মপাতার মতো। চাইলেই কাউকে জীবনের সাথে বেঁধে ফেলা সম্ভব ছিলো না। চিত্রা আমাকে পদ্মপাতার জীবন থেকে বের করে এনেছে। এখন আর প্রেম লুকাতে পারি না।

জ্যৈষ্ঠ মাস তখনো শেষ হয় নি। বিকেল থেকেই প্রচুর গরম পড়েছে। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। বৃষ্টি হবার লক্ষণ। বৃষ্টি আসলে খারাপ হবে না। ফ্যানের বাতাসেও গরম লাগছে। সন্ধ্যা থেকে বারান্দায় বসে আছি বৃষ্টির অপেক্ষায়। বৃহস্পতিবার রাত জাগতে সমস্যা নেই। পরদিন ছুটি, ক্লাস নেই। অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমানো যাবে। বৃষ্টির অপেক্ষা করতে করতে যদি রাত পার হয়ে যায়, তবুও বেলকুনিতেই বসে থাকবো।  যদি তবুও বৃষ্টি না আসে, দুদিন বাদে বর্ষা তো আসবে? বৃষ্টির সময়কার স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে লাগিয়ে তবেই আমি ঘুমোতে যাবো। তারপর ঘুম থেকে উঠে বের হবো কদমফুলের খোঁজে। বর্ষা আসতেই কদমফুল ফুটে। শহরে কদম গাছ খুব কম। তবুও খুঁজে খুঁজে একগুচ্ছ কদমফুল এনে চিত্রার হাতে দিবো। চিত্রা যদি গোলাপ চায়? আমি আর সাদা গোলাপ খুঁজতে যাবো না। চিত্রা বলেছে সাদা গোলাপ নাকি বন্ধুত্বের প্রতীক। আমি এবার প্রেমিকের বেশে লাল গোলাপ নিয়ে ফিরবো। সাথে রক্তজবা খুঁজতে হবে, চিত্রার খোঁপায় গুঁজে দিতে। চিত্রার ইচ্ছে হলে নীল শাড়িতেই আমার সামনে আসবে। প্রথমবার সুযোগ হবে ভালোবাসি বলার!

আকাশে একটুকরো চাঁদ ছিলো, সেটাও মেঘের আড়ালে ঢাকা পরে গেছে। সমস্ত জোৎস্না নিভে গেছে। একটু পর পর মেঘে মেঘে সংঘর্ষ, বিদ্যুৎ চমকানিতে শহরে আলোর ঝলক পরে। বজ্রপাতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ঝড়ো বাতাসে গাছের পাতা আবার নড়তে শুরু করে। ঝড়ের পরিমান বেড়ে গেছে। বেলকুনির সামনে নারকেল গাছের ডগা গ্রিলে এসে লাগে। পশ্চিমমুখী বারান্দা হওয়ায় দক্ষিণ দিক থেকে আসা ঝড়ে বৃষ্টির পানি বেলকুনিতে ঢুকতে পারে না। দক্ষিণমুখী চিত্রার ঘরের জানালা খোলা। নিশ্চয় পানি ঢুকছে। বেলকুনি ছেড়ে আমি যাই চিত্রার ঘরের জানালা বন্ধ করতে। বাতি নিভানো, তবুও বিদ্যুৎ চমকানিতে হটাৎ হটাৎ সমস্ত ঘর আলোকিত হয়। আলো এসে চিত্রার মুখে পড়ে। চিত্রা ঘুমোয় নি জেগে আছে। চোখ দুটো খোলা। যতবার ঘরে আলো আসে, ততোবার চিত্রাকে দেখি। চোখ সরানোর প্রয়োজন নেই। বাইরের ঝড় হয়তো থেমে যেতে পারে, কিন্তু বুকের ভেতরে বয়ে চলা ঝড় অপূর্ণতায় থামাতে নেই। কি সুন্দর চাহনিতে আটকে গেছি আমি, চিত্রা চোখ সরায় না। আমি একটু কাছে গিয়ে বসি। জানালা দিয়ে ঢুকতে থাকা ঝড়ো বাতাস গায়ে লাগতে থাকে। চিত্রা উঠে বসে। বাতাসে সমস্ত চুল উড়তে থাকে। চাহনি থেমে যায়। চুলে সমস্ত মুখ ঢেকে যায়। এতো সুন্দর চোখ আমি আবার দেখতে চাই। হাতের স্পর্শে আলতো করে কপালের চুল সরাই। স্পর্শে চিত্রা কেমন কেঁপে উঠে। সমস্ত ভাষা চোখে চোখে। প্রেম এমনো হয়; নিঃশব্দে!

হটাৎ জোরে বিদ্যুৎ চমকানিতে আমি উঠে পরতে চাইলে চিত্রা হাত টেনে ধরে। বলে,
‛থাকো না?’
‛আরো থাকবো?’
‛হ্যাঁ।’ বলে চিত্রা তাকিয়ে থাকে। আমি চোখ ফিরিয়ে নেই। বুকের ভেতরের জলোচ্ছাস হৃদপিন্ড ছাপিয়ে সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ে। বাইরে ঝড়ের শব্দ ছাড়া ভেতরে নীরবতা। চিত্রাই আবার নীরবতা ভাঙে। বলে,
‛আসো না?’
ঘাড় ঘুরিয়ে আবার চিত্রার চোখে তাকাই। চোখের এ ভাষা আর শুধু লিখতে চাই না কবিতায়। আরো কাছ থেকে সবটা পড়ে নিতে চাই। চিত্রার দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলি,
‛কোথায়?’
চিত্রা আস্তে জবাব দেয়,
’কাছে।’
আমি আরো কাছে গেলে চিত্রার নিশ্বাস বন্ধ হবার মতো হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে আবার খুলে। আমি বলি,
‛কতোটা কাছে?’
চিত্রা আরো আস্তে জবাব দেয়। শুধু আমার কান পর্যন্ত আসে,
‛খুব কাছে। যাতে আমিই আর ছাড়তে না পারি।’
ততক্ষনে চিত্রাও কাছে আসে, আমি আরো কাছে যাই। দুজনের মাঝখানে দূরত্ব কমে আসে। ঠান্ডা বাতাস শরীরে শিহরণ জাগায়। প্রথমবার চুমো খাওয়ার জন্য আমি চিত্রার গালে হাত রাখি। চিত্রা ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়। মনে হয়; অনন্তকাল ডুবে থাকতে চাই এই উষ্ণ ঠোঁটের চুম্বনে। কিন্তু উপায় নেই; ততক্ষনে শরীরের সমস্ত কোষ জেগে গেছে। ঠোঁট সরিয়ে নিলে চিত্রা বলে,
‛ছেড়ো না প্লিজ।’
‛ছাড়বো না।’ বলে আবার সামনে যেতে চাইলে চিত্রা শুয়ে পড়ে। আমি ঠোঁটের স্বাদ ভুলে ঘাড়ে চুমো খেতে থাকি। চিত্রা সর্ব শক্তিতে জড়িয়ে ধরে। বলে,
‛আরো আরো আরো কাছে আসো। আজ আমার সব শুধু তোমার।’
আমি আর কিছু বলতে পারি না। বাকি শরীর শাড়িতে ডাকা। আমার মুখ নীচে নামতে থাকে। চিত্রা শাড়ির আচল সরিয়ে দেয়। ব্লাউজ খুলে স্তনযুগলে চুমো খেতে থাকলে চিত্রা আমার শার্ট খুলে ফেলে। ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকি নগ্ন চিত্রাতে। মাতাল হই নাভির নিচে নূনের সমুদ্রের জল পান করে। চিত্রা অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে। বিদ্যুৎ চমকানিতে পুরো ঘর মাঝে মাঝে আলোকিত লাগে। আমি দেখি নগ্ন চিত্রাকে। যে নারীকে শাড়িতে ভালোবাসি, নগ্নতায় কাছে টেনেও ততোটাই ভালোবাসি। গভীর প্রেম কাছে টেনেছে দুজনকে। প্রকৃতি খেলছে তার আপন নিয়মে!

ঝড় থামে অনেক রাতে। চিত্রা আমার বুকে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে গেছে। মানুষটাকে এভাবেই চিরকাল জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। তবুও শাড়িটা পাশে ভাঁজ করে রেখে, নগ্ন শরীর কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেই। আমি আবার গিয়ে দাঁড়াই বেলকুনিতে। নারীর শরীরে সুখের তীব্রতা এতোটুকু থাকতে পারে, সেদিনই প্রথম মাথায় ঢুকে। অভিভূত ছিলাম কয়েক মুহূর্তের সুখের আনন্দে। আচ্ছন্ন ছিলাম অনুভূতিতে;
নারীর দেহ বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি শুনেছি,
চিরকাল শুধু মোহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়েই দেখেছি,
সেদিনই প্রথম ছুঁতে পেরেছি,
নিশুতি রাতের নিস্তব্ধ জোয়ারের মতো প্লাবিত হয়েছি!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এখনো ভালোবাসি তোমায়

বলতে পারিনি "ভালোবাসি"!

একটি প্রত্যাখানের গল্প: "তবুও ভালোবাসি"